নির্বিষ চন্দ্রবোড়া ও প্রিয় নির্বাসন
- Get link
- X
- Other Apps
প্রেম
এইমাত্র সে ঘুরে গেছে এখান থেকে
ছোটো বড় ছায়াগুলো, এখানে ওখানে, পড়ে আছে এখনও
তার শরীরের গন্ধ আর রঙ সঙ্গে নিয়ে
আমি তখন একটা বড় বটগাছের উল্টোদিকে ছিলাম
সেতারের কণ্ঠে একটা করুণ আর্তনাদ আঁকা হচ্ছিল
ক্ষীণ রেখার অবয়বে
নদী যেমন বহুদূর থেকে মানুষকে ডাকতে পারে
সে রকমই কিছু প্রাকৃতিক নাড়ি-যন্ত্রণা
যা এখনও আবিষ্কৃত হয়নি
আমন্ত্রণপত্রের বয়ান লিখতে থাকে
তার সঙ্গে দেখা হয়নি যাদের যাদের
তাদের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে যাব একদিন তার কাছে
এখন কেবল এটুকু বলে রাখি
নিছক প্রেম নিয়ে আমি কখনও কোনো কবিতা লিখিনি
ঠিকানা
তোমার ইশারা পেয়ে
আমি দ্রুত এগুতে থাকি
যে ঘটনাটি ঘটবে
তার দিকে
কিছুদূর যাওয়ার পর
ইশারাটি স্বয়ং আমাকে বলে
তুমি তাকে পাঠাওনি
সেই মুহূর্তে
যে ঘটনাটি ঘটবে না
তাকেই ঘটবে বলে ধরে নিয়ে
চুম্বককে পাঠিয়ে দিতে পারি তার দিকে
অথবা একটা মর্মরমূর্তি
স্থাপন করতে পারি সেখানেই
আর নয়তো, নিজেকে
জাইগোট থেকে বিচ্ছিন্ন করে
ফিরে যেতে পারি জন্মদাতার শুক্রাশয়ে
এরমধ্যে কোনোটিই না করে
ইশারাটি যে পথে এসেছিল
সে পথ ধরে পিছতে থাকি
এবং সে পথ আমাকে পেয়ে
নিজেকে তৈরি করে চলেছে অবিরাম
মধ্যবিত্ততা
যে দিনগুলোকে নিয়ে ভয় থাকে, উৎকন্ঠা থাকে
সেগুলো একদিন পিছনে চলে যায়
এবং পিছু ফিরে তাকালে দেখি
সব্জির শুকনো খোসা তারা
উপরের স্তবকে লেখা শব্দগুলোর মধ্যে
দান্তে বা গ্যাটেকে খুঁজে পাওয়া যাবে না
আমাদের পাড়ার ভূতপূর্ব কোনো যুবককে পাওয়া যেতে পারে
পাড়ার ছেলে বা ঘরের মেয়েকে নিয়ে লেখা উপন্যাস
পেঙ্গুইন থেকে ছাপা হয় না
সোনালি চুল, নীল চোখ অথবা
কালো ত্বক, মোটা ঠোঁট
টেস্টস্টেরন বা কর্টিসল ক্ষরণে সাহায্য করে
ঘড়ির কাঁটা নাকি
একই পথে ঘুরে মরছে সারাজীবন
তার বৃত্তাকার রাস্তাকে এবার অন্য কোনো আকার দেওয়া হোক
মিথ ও ইতিহাসের কথা না ভেবে
আশঙ্কা
বসন্তময় পৃথিবীতে আমরা দেখি
প্রতিমুহূর্তে অজস্র শাখার উঁকি ফুটে উঠছে
কাণ্ড ও পাতার তিরিশ ডিগ্রি কোণে
হাজার হাজার সূর্যোদয়
এদিকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধে ভেঙে পড়ছে
মানুষের সভ্যতার আস্ফালন
সংবাদমাধ্যমের ব্রেকিংনিউজের লালায়
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশার বীজ রোপণ হচ্ছে মহা তৎপরতায়
বিপন্ন হয়ে পড়ছে আশঙ্কা শব্দটির অস্তিত্ব
কিছু মানুষ পূর্বে যাচ্ছে
কিছু পশ্চিমে
এরা কি সূর্য সন্ধানে নাকি হননের বিলাসে? জানে না
একটা অদ্ভুত রকমের স্লোমোশনের ঝড় আসছে পৃথিবীতে
একটু বড় সাইজের কালো ছাতা বা ত্রিপলও বলা যায়
নেমে আসছে
একটা জানালা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ,তো ভেঙে যাচ্ছে অন্য একটা
একদিকে বসন্ত, অন্যদিকে মৃত্যুর নিখুঁত আয়োজন
একদিকে প্রকৃতি, অন্যদিকে কুম্ভকর্ণ
এক জি-বি জীবন
বাজার থেকে কিনে আনি দৈনিক এক জি-বি মোবাইল-ডাটা
প্রতিদিনের বাঁচার মেয়াদ ওইটুকুই
সদ্-অসদ্ ,বৈধ-অবৈধ, গোপন-প্রকাশ্য
যেভাবেই তা খরচ করি না কেন
বাঁচিয়ে রাখার চাবি বাজারের হাতেই
তুমি যেভাবে সময় নষ্ট করছ ফেলে ছড়িয়ে
মোবাইল-ডাটার সক্রিয় অপশনে
নিজেকে খরচ করে ফেলছো হু-হু করে
আবার যদি তা নিষ্ক্রিয়ও রাখো
পাল্টে যাওয়া তারিখ তোমাকে মৃত ঘোষণা করবে
আমার এক জি-বি ,তোমার এক জি-বি, যোগ করলে
আমাদের যৌথ বাঁচার মেয়াদ কিন্তু দু জি-বি হবে
ঈর্ষা
আমি না থাকলে আলো নিজেকে খুঁজে পেত না
হাতল দেওয়া একটা কাঠের চেয়ারে আমি বসে আছি
কিছু গাছপালা ছাড়া
কোনো মানুষ বা ইতরপ্রাণী
এ ঠিকানাকে আপাতত স্বীকৃতি দিচ্ছে না
অভিধানের ভাষায় নির্জন বললেও ঠিক বলা হয় না
দুর্গের দেওয়ালের অহংকারে একটা ফাটল ছিলো
সেই দুর্বলতাটুকু খুঁজে বার করে
আলো এসেছে আমার কাছে
নিজেকে আবিষ্কার করতে
যে কাঠের চেয়ারে বসে আছি
আসলে সেটা একটা সিংহাসন
আমার সঙ্গে আলোর মাখামাখি তো সে
ভালো চোখে দেখতে চায় না
নির্বিষ চন্দ্রবোড়া
নিজেকে নিজে বেষ্টন করছিল চন্দ্রবোড়া
ঘুরছিল আর কুণ্ডলী পাকাচ্ছিল
নিজের দখল করা জায়গায়
কোথাও একচুল যেন ফাঁক না থাকে, যেন
মেধা, মনন আর হরমোন দিয়ে ইট বানাচ্ছিল
গেঁথে গেঁথে ভরাট করছিল নিজেকে
দংশনের প্রয়োজন এবং পদ্ধতি ভুলে গিয়েছিল
নিজেকে নির্বিষ করার সাধনায়
ভোঁতা করেছে সব ইন্দ্রিয়কে
স্থবির দেহখানি নিয়ে সে এখন দেখে
চারদিকে উঁচু উঁচু গাছ আর প্রচুর শূন্যতা
মাটির নিচে অনেক গভীর পর্যন্ত শেকড় আর
মাঝে মাঝে নির্বাক জল
ঘর
এতকাল কলকে ফুলকে কলকে ফুল বলেই জানতাম
হাঁসের ডিমকে হাঁসের ডিম বলেই ছিল বিশ্বাস
যেমন শিখিয়েছিলেন বেসিক ইস্কুলের দিদিমণি
ষাট বছর বয়স হলেই
প্রবীণ নাগরিক হয়ে যাব বলে নিশ্চিত ছিলাম
উডপেন্সিলের ব্যবহার করতে অসুবিধা হয়নি কখনও
আজ বিশ্বাস শব্দটিকে আঁকার জন্য
প্রয়োজনীয় রঙ খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও
সিঁডি এবং লিফ্টের মধ্যে, কোনটা বেশি নিরাপদ
তর্জমায় পাচ্ছি না
অথচ কতবার তো দেখেছি
একটুকরো থার্মোকল থেকে বেরিয়ে আসছে সেই আশ্রয়টি
যাকে আজও আবিষ্কার করেনি কেউ
ছায়া
অবশিষ্ট বয়সটুকু একদিন
চটিজোড়াকে বলল -
এবার তোমাদের ক্লান্ত হবার সময় হয়েছে
তাই ওরা তখন
দেওয়ালে ঠেস দিয়ে, পাশাপাশি, দাঁড়িয়ে পড়লো
আলো সেসময়ে ,সেখান দিয়েই, যাচ্ছিল
তার কারণেই
চটিজোড়ার ছায়া পড়লো তাদেরই পাশে
আর তারা অবাক হয়ে দেখল -
তাদের ছায়াগুলো হুবহু তাদের মতোই
আমি একদিন এক জানুয়ারির এক তারিখের সকালে
একটা শুকনো কাঠের চেয়ারের ছায়াকে
অনেকটা লম্বা দেখেছিলাম
সময়
ফ্যান ঘুরছে
ক্যালেন্ডার নড়ছে
আলো জ্বলছে
দরজার ছায়া পড়েছে
ঘড়ি চলছে বলে
সূর্য পৃথিবীকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে
আমি চোখ বন্ধ করলেই
এরা সবাই ঘুমিয়ে পড়বে
এরপর
আর যাকিছু বলার বাকি থাকে
তা দিয়ে জাল বুনবে মাকড়সা
গানের লং-প্লেয়িং রেকর্ড
সম্পর্ক
এতদিন যাকে জল বলে ডেকেছি
আদর করেছি
ঘাড়ের কাছে ঠোঁট ঘষে ঘষে লিখেছি গীতগোবিন্দম
আজ পাখি বলে ডাকলেও
সে বোঝে তাকেই ডেকেছি, এমনকি
পাথর বললেও রাগ করে না
সে আর আমি
ভূগোলের অসহায়ত্ব উপভোগ করি
বেচারা ভূগোল যখন
দূরত্ব বাড়াতে বাড়াতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে
দূরত্ব বাড়ে না
জেগে-থাকা
আজ বহুদিন পর
ঘর আমাকে পেয়ে অবাক হয়েছে
এতদিন লোকটা ছিল কোথায়!
সৃষ্টিতে যত ঘুম ছিল
সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে
পৃথিবীর সব জীব ও জড়ে, কেবলমাত্র
এই একটা লোককে বাদ দিয়ে
একগাদা জেগে-থাকা নিয়ে
খাবলা খাবলা করে মাখছে আর
ঘুরে ঘুরে দেখছে নিজেকে
আজ বহুদিন পর আমার ঘরটা
আমার ঘর হয়ে উঠছে
লাশ
আঘাতের চুম্বন আর চুম্বনের আঘাত দিয়ে
আমি তাকে চিরে চিরে দেখি
তাতে, আমার উপরে, তার অন্যান্য বৈধ সম্পর্কগুলো
ক্ষুব্ধ হয়
আমাকে কর্পূরধর্মী করে তুললে চায়
গুণ্ডা লাগিয়ে
ভ্রুক্ষেপহীন-আমি, তার রক্তপাতে, কলম ডুবিয়ে
তাকে আঁকতে থাকি
তার কথাও কিছু না বললে চলে?
সেও আমাকে তার বৈভব দেখিয়ে দেখিয়ে
মৃত্যুর স্বাদে ভাগ দেয়
দাগ
ঘরের মেঝে আমাকে জিজ্ঞাসা করে -
ঘন, থকথকে, লালচে-কালচে, বাবলার আঠার মতো
কী এটা?
তাকিয়ে দেখেই বুঝি -
কেউ বলে যন্ত্রণা
কেউ বলে প্রেম
আমি কিন্তু বলি না তেমন কিছু
সামান্য ঘরের মেঝে
সরল ঘরের মেঝে
সমতল মেঝে
এসব জটিল কথা বুঝবে না ভেবে
ভিজে ও ঠাণ্ডা কাপড় দিয়ে মুছে দিই
সাধনা
নদী, মাঝেমাঝে শুকিয়ে ফেলে নিজেকে
জলের দেমাক যেন না জন্মায় বুকে
বর্ষা, যতই সে তরল হোক, ঝমঝম হোক
সহজে দেয় না সাড়া
আড়ালে আড়ালে, নিরাকারকে সঙ্গ দিয়ে
নদীর সাধনা পেতে চায়
ফুলের গাছের ফুল গাছকে যেমন
এইসব কথা দিয়ে ইমারত গড়া যায় না
চতুর্ভুজ, ষড়ভুজ।কেবল
অসংখ্য বীজের সম্ভাবনাময়
লাল টুকটুকে টমেটো গড়া যায়
স্মৃতি
বাইরে দিয়ে হেঁটে গেছে কেউ
ঘরে এসে পড়েছে তার ছায়া
চেয়ারে বসাই তাকে, ঠাণ্ডা জল দিই
নাম দিই পছন্দ মতো
সর্বনাম দিই
কিছুকাল কথা হয় ছায়াতে আমাতে
যে লোকটা হেঁটে চলে গেছে
হঠাত্ খেয়াল করে
ছায়া তার সঙ্গে সঙ্গে নেই
ভুল হয়ে যায় তার রাস্তার সমস্ত পথ
হয় দিশাহারা
সরোদ
লোকে তাকে সরোদ বলে চেনে
আমি তাকে সঠিক চিনি না
বুকে তার তাপমাত্রা মাঝেমাঝে বৃদ্ধি পায়
ধূপের ধোঁয়ার ছায়া যেরকম যাওয়া আসা করে
সেরকমই এক ব্যথা জন্ম নেয় তার বুকে
বার হয়, পথে পথে হাঁটে
লোকে তাকে সরোদ বলে চেনে
সুরে মুগ্ধ হয়
আমি তার ঘামের স্বাদ বুঝতে পারি না
কেবল নাকাল হই
ছোঁবার বাসনা পুষে রেখে
নেশা
খুঁজে দেখবার জন্য
একটা বিশেষ রকমের জ্বর দরকার হয়
আর সে জ্বর খুব সহজপ্রাপ্য নয়
বেলিফুলের মধ্যে
সুগন্ধ ঠিক কোথায় আছে
খুঁজতে খুঁজতে জ্বর নিজেই
জ্বরহীন হয়ে পড়ে কখনো কখনো
বেলিফুলের একেবারে ভেতরে
একটা পুকুর আছে, গন্ধের পুকুর
জ্বর সংগ্রহ করা, জমা রাখা তার নেশা
চাঁদের আকাশ খুঁজতে গিয়ে, মাঝরাতে, দেখি
বিরাট একটা জোনাকি পোকার গাছ
রহস্য
অসংখ্য মানুষের প্রোফাইল আমার সামনে
সেসব দেখার সময় হয় না কখনও
ভাবি, একবার দেওদারুকে দেখব
একবার গাঁধালপাতার লতাকে
ভাবনার সুইচ একটা জোনাকির হাতে
সমস্ত চান্দ্রমাস ,সৌরমাস জুড়ে
তার প্রোফাইল নিয়েই পড়ে থাকি
একটা ছোট্ট জোনাকিতে কতকিছু দেখার আছে
দেখতে দেখতে আশ্চর্য হই
আমার সমস্ত শরীরটা কেবল একটা
সুস্থ, তাজা, অপলক চোখে পরিণত হয়
কবি
দিনেরবেলা লোকটা কখনও ঘুমায় না
রাতেও, সে কাজে, সময় দেবার সময়
তার নেই
অথচ সে পরিষ্কার বুঝতে পারে
কুম্ভকর্ণের সঙ্গে তার
কোনো প্রভেদ নেই এবিষয়ে
সমস্ত কবিতা লেখাই, যেগুলো
তার হাতে লিখিত হওয়ার কথা, বাকি রয়ে গেছে
লোকটা ঘুমাচ্ছে, আর সেই কবিতাগুলো
সারিবদ্ধ অপেক্ষা করছে
ঠিক তার ঘরের দরজা থেকে
আবর্তন-নিষ্ঠ প্লুটো পর্যন্ত
বিদেহী
লম্বা, স্থূল এবং স্পাইরাল ছায়া পড়েছে হাওয়ার
এইসব ছায়া থেকে যত ভয় উৎপাদন হয়
বিক্রির জন্য চলে আসে বাজারে
আমরা কিনি
এখানে করবীগাছ আছে, নয়নতারা আছে
মুসান্ডাও আছে
তাদের কোনো ছায়া দেখা যায় না
তাদের সঙ্গে যেসব ঋষি-পতঙ্গদের পরিচয় আছে
সকালে ,চা-পর্বে , দেখা হয় প্রতিদিন
তাদেরও কোনো ছায়া পড়ে না
ছায়া বিষয়ক সেমিনারে
বিশেষজ্ঞ-বক্তাদেরও
ছায়া পড়তে দেখেনি কেউ কখনও
বাঁশি
কলসির জল গড়িয়ে গড়িয়ে
ক্রমশ বিকালের দিকে
বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়কে মানুষ
বসন্ত বলে
বসন্তকালের সকালের মতো বিকালেও
কোকিল একটু বেশি মাত্রায় ডাকে
পাড়ার মোড়ে মোড়ে
সরকারি কলের নামে
কোনো কোনো জায়গা এখনো খ্যাতি পায়
কলসিগুলো যখন সেখানে জল নিতে আসে -
রাস্তার উপর কোকিলের মৃতদেহগুলো
অবিরাম ডেকে চলে- রাধা, রাধা, রাধা
নৈকট্য
সকাল সকাল গাছ তাদের অপছন্দের কথা জানিয়েছে
জানিয়েছে- আমার ছোঁয়া তারা পছন্দ করে না
যত মূল্যবান সার, ওষুধের ব্যবহারই করি না কেন
ফটিকস্বচ্ছ কাচের গ্লাসে দিই তাদের পানীয়জল
তারা আমার দময়ন্তী হবে না
এতদিনে গাছেদের কিছু কিছু ভাষা আমি বুঝতে শিখেছি
তাদের মনের কথা অনুবাদ করে দেখি বারবার
নলরাজ বলে তারা আমাকে মানে না
দূরত্ব দিয়ে আমি তাদের বিশ্বাসকে সম্মান জানাব
পোস্টম্যানের সাহায্য নেব
স্বপ্ন
জল পাঠিয়ে দিয়েছে নৌকো, আমাকে নেবে বলে
আমারও বহুদিনের সাধ
তার শরীরে ভাসব, ডুবব
এখানে আমার শিকড় ছড়িয়ে পড়েছে ইটে পাথরে
শত্রু ও অকৃতজ্ঞ জনে
আলকুশি ও মাকালফলে
এদের ছেড়ে যেতে পারি না
দুএকটা পেঁপে ও পেয়ারাগাছও তো আছে
ক্যানভাসের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়েছি সেই নৌকো
উঠে বসেছি নিজে
জলের ছবি তুলে এনে পেস্ট করেছি সেখানে
শিকড়ও রইল , আকাশও রইল স্বপ্নে
পুঁজি
জানি এই শব্দ কয়েকটিতে কোনো গূঢ়চর্চা হবে না
কোনো পুণ্যলোকের দরজায় বা
মহাকাব্যের সর্গে পৌঁছানো যাবে না
তবু এই যে ফার্স্ট-লাভ ফুলের কমলা রঙের ছায়া
মাটির উপর ফুটে উঠছে টুকটুকে লাল হয়ে -
একে ভালোবাসতে পারব
জানি ,এই শব্দ কয়েকটির ক্ষমতায়
ডিলিট মিলবে না বিশ্ববিদ্যালয়ে
তবু এদের ডিলিট করতে পারব না
আমার অনুচ্চারিত স্বপ্নের উচ্চারণ থেকে
উইল করার মতো স্থাবর অস্থাবর এরাই
ঘুম
এখন সে জড়িয়ে ধরা শিখবে ময়ালের কাছে
তারপর একটু একটু করে গিলবে
ভাতের দানার মধ্যে ছিল
আগুনের মধ্যে ফুটেও সে মরেনি
জ্বলজ্বল করে জ্বলবে এবার চোখে চোখে
জলের গোপন রূপে
নেশার হাতে একটা বড় আকারের জাল থাকে
ছড়িয়ে পড়ে প্রান্তদেশে
আমি কেন বাদ পড়ে যাই বারবার
আমি কি কারো আহার হতে পারি না
ক্ষণিক
এক মিনিটের ঘুম
আসতে এক মিনিট
থাকে এক মিনিট
যাবার পর ,শরীর জুড়ে ,ক্ষত রয়ে যায় এক মিনিট
সেই এক মিনিটের ঘুমের মধ্যে
আস্ত একটা 'তুমি' রয়ে যায় শুরু থেকে এপর্যন্ত
কয়েকটা গ্রাম, কয়েকটা শহর
আর কিছু রাস্তাও রয়ে যায় আপাদমস্তক
কমবেশি যারা তোমাকে চেনে
আবার সে আসছে
এক মিনিটের জন্য বসেই বলবে - যাই
জানি না
নক্ষত্রকে নিয়ে অনেকেই অনেককিছু লেখে
তারা যে অনেককিছু জানে
বোঝা যায় , এমনকি
নক্ষত্র নিজেও নিজেকে নিয়ে অতটা জানে না
এইযে জিরে-জিরে পাতার গাছটি
হলুদ-হলুদ ফুল ফুটিয়েছে বিন্দু-বিন্দু
আমি তার নাম জানি না
সে নিজেও অমলিনভাবে জানে না
গরমের দিনে হঠাত্ মেঘ করে এলে যে হাওয়া আসে
তা আমাদের দুজনেরই বেশ ভালোলাগে
নক্ষত্রের ঘরে কটা ফ্যান আছে
কটা এসি আছে বা আরও উন্নত কোনো সুবিধা
আমরা জানি না
প্রতারক
তার জানালায় সবুজ আলো জ্বলে ওঠে
অথবা যে জানালায় এরকম হয়, সেটি তার
অথবা পৃথিবীর যে যে জানালায় সে আলো থাকে
সেইসব জানালাগুলোই তার বাড়ি
এই আলো আমাকে খুব মিষ্টি করে বোঝায়
পৃথিবীর সব বাড়িতেই আমন্ত্রণ আমার
আমন্ত্রণ পাওয়ার আনন্দে আমি ছুট শুরু করি
সে বাড়ির দিকে, সেই সেই বাড়ির দিকে
দূরত্ব যখন প্রায় বিপন্ন হয়ে পড়ে -
আমি আর সে মিলে আমরা হয়ে পড়ব
হঠাত্ সেই আলো, সেইসব আলো, লাল হয়ে যায়
ছুটন্ত গাড়ির চাকার নিচে থেঁতলে যায় আমার বিশ্বাস
কোটি কোটি মৃতদেহের মুখ থেকে উচ্চারিত হয় -
সবুজ সংকেতের আলো এক তীব্র প্রতারক
সময়
সময় তরল
উপচে প'ড়ে ,গড়িয়ে গড়িয়ে, নালা নর্দমায় গিয়ে
নষ্ট হয়
অথবা সে সময় অন্য কারো সঞ্চয় বাড়ায়
বড় বড় জালা, গামলা, ড্রামের মধ্যে ধরে রাখি
প্রয়োজনে প্রয়োজন মতো খরচ করব
এই ভেবে, হয় না
সময়েরও চুল পেকে যায়, দাঁত নড়ে
দু-হাঁটুতে কার্টিলেজ পাতলা হতে হতে
নিঃশেষ হয়ে আসে
এখনও যেটুকু সময়
ওষুধের দশ এম-এল-চামচে অবশিষ্ট আছে
কলমে ঢুকাতে পারলে
তোমার মুখশ্রীটুকু লিখে ফেলা অসম্ভব নয়
যন্ত্রণা
আমার লেখার খাতায়
সাদা-সাদা, হাল্কা-নীল আভা যুক্ত -
মথের ডানার রেণু যেমন হয়, নরম, থোকা-থোকা
পোকা লেগেছে
লোকে বলছে - ছত্রাক, বলছে -
এই ফাংগাস খুব ক্ষতিকর
সংক্রমণ হলে
চোখের সমস্ত জল শেষ হয়ে যায়
এইসব কথা শুনলে
বেচারা সমুদ্রের জন্য
হু-হু করে ওঠে বুক
সেই রেণু বা পোকা বা ছত্রাক বা ফাংগাসগুলো
সমস্ত গাছের ডালে ঝুলিয়ে দিয়েছি
নির্দিষ্ট সময়ে ওরা বাজবে। বাজলে
রবিশংকর, বিসমিল্লা, যশরাজরাও
নতজানু হবেন
প্রত্যক্ষ করবেন নিজের নিজের বুক
লোভ
আম খেতে খুব একটা ভালোবাসি না
পেটে সহ্যও হয় না
বাজারে স্তূপাকার করে আম বিক্রি হয়
বিভিন্ন আকার, রঙ আর গন্ধের
সাধারণত আমি কিনি না
খুব সস্তা হলেও না
অন্য কেউ খেতে চাইলে, আনতে বললে
এনে দিই
কিন্তু সেদিকে আর ফিরেও তাকাই না
অথচ তোমার বাগানের আম আমাকে খুব টানে
বারবার চোখ যেতে চায় সেদিকে
হাত নিশপিশ করে
তোমার মালি আছে, কর্তব্যনিষ্ঠ, সদাসতর্ক
আমাকে সে সেদিকে তাকাতে দেবে কেন!
ভীতি
ঘুমের খুব তলায়, একেবারে নিচে
থিতিয়ে পড়েছিলে তুমি
সেখান পর্যন্ত গিয়ে তোমাকে স্পর্শ করার
সাহস হয়নি
তলিয়ে যাবার ভয় জেগেছিল মনে
ভাঙা একটা কাঠের চেয়ারে
সারাদিন বসে বসে ঢুলতে থাকি
ঘুমাই না
ডাক্তারের কাছে যাই মাঝেমাঝে
ঘুম যেন না পায় তার ওষুধ দিতে বলি
আর্তি ব্যয় করে
ভুল-ঠিকানা
অনেকগুলো ঠিকানার সম্ভাবনা ছিল
বাড়ির নম্বর, রাস্তার নাম, পোস্টঅফিসের পিনকোড
নির্ভুল ছিল প্রত্যেকটারই
গ্রীষ্মের দিনে আমপান্নার শরবত কিংবা
ঘরে-পাতা দইয়ের লস্যিও ছিল
শীতের দিনে ছিল
দামি চা-পাতার রঙ ও গন্ধ, অথবা
কফির উষ্ণতা
তবু যাওয়া হয়নি
ভুল-ঠিকানার আকর্ষণ ছিল তীব্র
শহরের প্রত্যেকটি রাস্তা আজ
হাজার হাজার পথচারী পেয়েও
তীব্র একাকিত্বে ভুগছে
রাস্তা তার নিজেরই হাতের আঙুল
ধরতে পারছে না নিজে
রেজারেকশন
কেউ একজন এখান থেকে চলে গিয়েছিল
তারপর এই হতভাগ্য জায়গাটার কী কী হয়েছিল
তা নিয়ে কেউ কোথাও কিছু লেখেনি
একজন চিত্রশিল্পী তাঁর ক্যানভাসের সঙ্গে
গল্প করছিলেন
সেখানে যে মেয়েটি দাঁড়িয়েছিল অদূরে
তার বুকের পিয়ানো
কথাকে গাইতে শেখাচ্ছিল
গাছেরা, মাছেরা, পাখিরা আর কিছু না-থাকারা
সকলেমিলে একসঙ্গে
নামাজ পড়ছিল
যে চলে গিয়েছিল সে আবার ফিরে আসছে
জানা গেল আবহাওয়া খবরের অনুবাদ করে
গাহন
কেউ যদি ঘুমাতে চায়, ঘুমাতে দিও
কেবল তাকে বলে দিও
নির্দিষ্ট সময়ে ফের জেগে উঠতে হবে
একটি কাকের বিশ্বাস বিশ্লেষণ করে দেখেছি
কেবল কলসির জল নয়
ভোরের অনিবার্য বকুলতলাও
এইসব কথা যখন ক্লাসের পাঠ্যে আলোচিত হয়
একটি পুকুর তখন জল, স্থল ও তলদেশে
আকাশকে নিয়ে ডুবে থাকে
কোন শালুকের পাপড়িতে
কোন মাছের পুরুষ অঙ্গের স্পর্শ লাগলো
কেউ জানতে চায় না
অর্বাচীন
খুব ছোটো শহর এটা একটা
মুঘল, পাঠান বা ইংরেজদের স্পর্শ নেই
এখানে কোনও পুরনো রাজবাড়ি নেই
নেই পঞ্চবটিদের অলৌকিক মিথ
রাতে ঘুমালে, এ শহর
এখনও তার ছেলেবেলার স্বপ্ন দেখে
একটা শালজঙ্গলের ভেতরে বসে আছি এখন
অদূরে রাস্তাগুলো ব্যস্ত রয়েছে
তাদের যাওয়া-আসা নিয়ে
দিবাস্বপ্ন
আজকের তাপমাত্রা চুয়াল্লিশ ডিগ্রি
একজন ফেরিওয়ালা তার পণ্য পাশে রেখে
গাছতলায় শুয়ে আছে
চতুর্দিকে কেউ কোত্থাও নেই
কাজেই বলা যাচ্ছে না সেটা কী গাছ
বিয়াল্লিশের ফেরিওয়ালা চব্বিশ হয়ে গেলে
গাছটি টের পায়, সেটা স্বপ্ন
দূরে অনেকগুলো পাখি কিচিরমিচির করছে
উড়াউড়ি করছে
স্বপ্ন স্বয়ং গিয়ে দেখে -
সেখানে একটা ছোট্ট জলাশয়
তার তলা থেকে উঠে আসা বুদ্বুদগুলো ব্যস্ত রয়েছে
নিজ নিজ স্বরচিত কবিতা নিয়ে
চশমা
আমি যেভাবে একটা ব্লেডকে দেখি
দর্জির সুতোকে দেখি
এরা সেভাবে দেখে না
এরা সাবেক জি-টি-রোড দেখেনি
রেকর্ড-প্লেয়ারে গান শোনেনি
এদের সঙ্গে আমি পরিচয় করতে চাই
ছুঁতে চাই, মাখতে চাই
আগামী বর্ষার গান এরাই গাইবে। শুনতে
আমি চাই আয়ুর দীর্ঘতা
আর নতুন চশমা
জীবন
আমার বাড়িতে ঢুকতে গেলে
তিনটে দরজা পার হতে হয়
রাতে সেগুলোর প্রত্যেকটিতে
একটি করে বিশ্বস্ত তালা ঝোলে
তবু কাল রাতে আমার খাস-কামরায়
(যেখানে আমি আর আরও অনেকগুলো আমি থাকি একাএকা)
দরজায় টোকা পড়েছিল
বিস্মিত হলেও দরজা খুলেছিলাম
যে এসেছিল সে খুবই নিরীহ একজন মানুষ
স্বয়ং মৃত্যু
টেবিলের উপর তোমার যে পোর্ট্রেটটা ছিল
আমি আঁকছিলাম দীর্ঘ সময় ধরে
শেষ হয়নি
সেটা খুব মন দিয়ে দেখল সে
তারপর ফিরে গেল
আমি এখন চায়ের কাপে আর স্বাদে
প্রিয় নির্বাসন
অনেকদূরে দাঁড়িয়ে আছে নির্বাসন
খুব ছোটো দেখতে লাগছে এখান থেকে
একটা অপরিচিত রেস্তোরাঁর খুব কাছাকাছি এসে পড়েছি
এখানে এলে নাকি তাকে পাওয়া যাবে
আপনি থেকে যে ক্রমশ তুমি হয়ে উঠবে
অনেকগুলো চাদরে নিজেকে ঢেকে রেখেছে রেস্তোরাঁটি
ভেতরে ঢোকার দরজা খুঁজে পাচ্ছি না
অন্য কোনও লোক বোধহয় এখানে আসে না
কাউকেই ওদিকে যেতে বা ওদিক থেকে আসতে দেখছি না
একটা ছাতিম গাছ কেবল দাঁড়িয়ে আছে অদূরে
হাওয়াতে তার খোশ মেজাজের ছবি
পিছু ফিরে সেই দূরবর্তী নির্বাসনের দিকে একবার তাকাই
হাত নাড়িয়ে সে আমাকে অভয় দিল
অসময়
সময় আজ ঠিক সময়ে এলো না
পথে কোথাও হয়তো আটকে পড়েছে
নিমগাছের ছায়া, কাক-বকের ঘরে ফেরা
বিকালের জলের কল
প্রত্যেকেই অপেক্ষায় ছিল
যেমন থাকে প্রত্যেকদিন
দীর্ঘদিনের অসুস্থ বৃদ্ধটি
কারও কাছে আবদার করে বলল না -
জানালার কাছে বসে
বিকালের সঙ্গে দু-চারটে কথা বলতে চায়
সার
আলোর ভাগ কেউ দিতে চায় না
মুখ ফিরিয়ে নেয়
গাদা গাদা অন্ধকার এনে
নিজের চতুর্দিকে স্তূপাকার করি আহিংকে মিটিয়ে
বাড়ি, ঘর, উঠোন ,মন পরিষ্কার করে
প্রতিবেশীরা তা ফেলেও দিয়ে যায় প্রচুর
খোলা মনে
সেই অন্ধকারের মধ্যে নিজেকে পড়ি
এত স্বচ্ছভাবে, এত স্পষ্টভাবে পড়া
আলোয় সম্ভব হয়নি কখনও
প্রেম
সাধনার এমনই ধর্ম
তার প্রথম কাজই হলো ভয় দেখানো
কাপড়চোপড় খুলে নিয়ে
একেবারে উলঙ্গ করে দেয়
থুতু ফেলে, গোড়ালি দিয়ে ঘষে
আকার ,আকৃতি , অধিকার, শুভ্রতা কেড়ে নিয়ে
বৌদ্ধভিক্ষুর চেয়েও নিঃস্ব করে দেয়
আমি তবু সাধনাকে ছাড়িনি কখনও, তাই
তোমাকে ছাড়ার কথা উঠবে কীভাবে !
তথাগত
আরামের খোঁজে গিয়েছিলাম কাল
হাজার ওয়াটের লোভী চোখ নিয়ে
যে আমাকে বর্ণ অক্ষরের পরিচয় করাতে চেয়েছে
নির্বিঘ্নে করাতে পারে যাতে
মেনসুইচের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়
মদন ও প্রেমের যোগ সমুদ্র সৃষ্টি করে যেখানে
সেখান থেকে
রুগ্ন, অচল, অর্থহীন ইন্দ্রিয়ের ক্ষত আড়াল করে
চুপিচুপি ফিরে আসি
যন্ত্রণা যেখানে শরীরচর্চা করে বৃদ্ধি পাচ্ছে
একটি সুস্থ বৃক্ষের চারা রোপণ করতে গুহামুখে
অন্য এক তথাগত গিয়েছিলেন তোমার কাছে
স্মৃতি
যাকিছু ছিল সবই বাইরে
ভেতরে কেবলমাত্র ছায়া
সেই ছায়া আর আমি
কল্পিত স্রষ্টার মতো
বাস্তবের আদি-অন্তহীন গ্রীষ্মের দুপুরে
একাএকা ,স্রেফ মাকড়সার জাল
হঠাৎই সেই ছায়া যদি একটু ফিকে হয়ে যায়
এঁকে-ওঠা ,চুপিচুপি, কথার চেহারা পায়
তোমার স্মৃতি তৎক্ষণাৎ
পুরনো কবিতার বই থেকে
পাশের চেয়ারে এসে বসে
আমার শব্দকোষ
অল্প ,খুব সামান্যই কিছু শব্দ আছে আমার হাতে
তাদের জন্য কোনো বর্ণাশ্রম রাখিনি
শোয়া,বসা ,খাওয়ার জন্য আলাদা জায়গা রাখিনি
সিংহাসন ও রাজবাড়িগুলো ভাঙিনি, কিন্তু
মাটির দুয়ার ,কুঁড়েঘর ,পাঁচইঞ্চি দেওয়ালের কুঁজোর চিত
এসবের মধ্যেই তাদের রেখেছি
আমার রাজা অক্লেশে মাটিতে বসেছে
রায়ত যখন সিংহাসনে
একটাই বিড়িতে চালিয়ে নিতে বলেছি দুজনকে
অল্প ,খুব সামান্যই শব্দ আছে আমার
কার গায়ে কোন বাদ লেগেছিল ভেবে বাদ দিইনি
পূর্বে-পশ্চিমে ,উপরে-নিচে,ডানে-বামে
ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ,ফিরিয়ে ঘুরিয়ে ব্যবহার করি
এদের দৌলতেই তো আমি নর্দমার সুগন্ধ চিনতে শিখেছি
জিঘাংসু প্রেম
একই সঙ্গে আমার পুজো ও চুম্বন পাচ্ছে
সঙ্গম পাচ্ছে , প্রণাম পাচ্ছে
তোমার প্রতি
কোন সম্পর্ক নির্ধারিত হবে আমাদের
যে রাস্তায় আমন্ত্রণপত্র নিয়ে গিয়েছিল পোস্টম্যান
সেই বাড়িতেই থেকে গিয়েছিল স্বয়ং
তারপর সেই রাস্তা, -
যে রাস্তায় সে ফিরে এসেছিল এখানে 'আমি' হয়ে
সেদিকেই আমার যাত্রাপথ স্বয়ংচালিত হচ্ছে
কী করি এখন ?
আদর ও খুন একসঙ্গে একই হাতে নিশপিশ করছে
কীভাবে মিটাব আজ আঙ্গুলের খিদে !
কেমিস্ট্রি
পাপের তৃষ্ণা পাথরকে বাঁচায় প্রতিমুহূর্তে
পবিত্র হবার প্রলোভন থেকে
হে প্রিয় পাপ ,হে প্রাণবন্ত পাপ ,অনিবার্য পাপ
অফুরন্ততাকে সত্যতা দেওয়ার তোমার ক্ষমতা
পাথরকে প্রতিমা করে তোলে
বুর্বকতার প্রতিভূ একজন ,সেই প্রতিমার হাত ধরে
মহাইউনিভার্সকে বিন্দু করে ফেলে
দু-পা মাত্র যেতে না যেতেই
মাটি তার গোপনতা উপহার দেয় বর্ষাকে
সেই পথে অনুগামী হয় বিদ্যুৎক্ষরণ
পাপের পরম অণু পুঁতে রেখে আসে
পুণ্যবান জন্ম নেয় এই রসায়নে কালে কালে
নতুন রহস্য
একটা বিপদশঙ্কু্ল জায়গা এবং সময়ের মিশ্রণ
দেখা করতে এলো আমার সঙ্গে
যেখানে এবং যখন
মানুষ গলায় দড়ি দেওয়ার প্রয়োজন বোঝে
টাটকা ,সুমিষ্ট এবং রঙিন ফুলের পচে যাওয়ার কারণ খুঁজে পায়
শবের প্রতিশব্দে শুধু নিজেকেই দেখে
তখনই এবং সেখানেই প্রেম এলো আমাকে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে
আমার আত্মজ সেদিনই এক অত্যাশ্চর্য অনাবিষ্কৃত জায়গায়
সুগন্ধের বিকল্প এক ঘড়িতে
এখনও পৃথিবীতে কেউ দেখেনি এমনই এক গভীর নীলরঙের
টুকটুকে লাল কথার সিম্ফনি উপহার দেবে
সমুদ্রমন্থন থেকে উঠে আসা এক যুবতীকে
রহস্যকে আমি আগে কখনও দেখিনি এভাবে
স্বপ্নের ফসিল
ঘুমের রঙ কেমন হয় ?
আমি যেটা এঁকেছি সাদা ,চিকন, রুমালি রুটি
তার শরীরে একটা আঠালো ভাব রয়েছে, ফেভিকল
তোমাদের কাছে তার রঙ যেমনই হোক -
(কালো এবং অন্ধকারকে তোমরা অভিন্ন বলো
হয়তো সেটাই ঠিক
আমি তাহলে যাকে দেখেছি
তার নাম ঘুম নয় , অন্য কিছু )
আমি দেখেছি তুষারে ঢাকা আস্ত একটা মহাদেশ
দিগন্তজোড়া চাদর গুটিয়ে এনে ভাঁজ করছিলাম
দু-ভাঁজ ,চার-ভাঁজ ,আট-ভাঁজ - এভাবে
ঘুমের ভাঁজের মধ্যে একদিন কেউ নিশ্চয় খুঁজে পাবে
স্বপ্নের ফসিল
মহারি
ওড়িশি-নাচের ছলে কেউ , একটু আগেই
ছড়িয়ে গেছে একঝুড়ি মেঘ
এখন সেই ডাঁসা মেঘের শরীর থেকে
ভেসে আসছে তার প্রসাধনী গন্ধ
মহারির রূপটান ছুঁয়েছে বাতাসকে
নেশা জমেছে তার মনে
ফুঁসে উঠছে শরীরের সব তীব্র মুদ্রা
বিদ্যুতের ঝিলিক দেখে ,কারো কারো অনুমান
কেলুচরণ ও সংযুক্তার যৌথ উল্লাসের গন্ধ
আকাশের গায়ে লেগে আছে
সূর্য না উঠলে
সূর্য না উঠলে চিন্তা হয়
শারীরিক অস্বস্তিও হয় কিছুটা
শুধু আমার নয় -
প্রজাপতি ,মৌমাছি,গাছপালা
প্রত্যেকেরই এরকম হয়
মেঘলা থাকার জন্য অনেক কাজ বন্ধ থাকে
অনেকে বাইরে ,দূরে কোথাও যায় না
কাচাকাচি করে না
অফিস কামাই করে অনেকে
এমনকি চানও করে না কেউ কেউ
সূর্য না উঠলে আমি প্রেসারের ওষুধ খেতে ভুলেযাই
ফুলের মরশুম
ছায়াগুলো নড়ে ,কাঁপে,নাচে
কী জন্য কোনটা হয়
বুঝি না প্রায়শই
কিন্তু আমার দৈনিক ওষুধের মাত্রা
কমা-বাড়া হয় সেজন্যই
ওয়ালপুটির দেওয়ালে রঙের দামি অহংকার
কিছু ছবির বিভ্রান্তি তৈরি করে
লেখা হয় কিছু ধীময় ভূতুড়ে গল্প
তুমি যখন সামনাসামনি থাকো
হাত বাড়িয়ে ছুঁতে পারি তোমাকে -
ছায়া বলে তখন আর কিছু থাকে না
সেটাকেই বলে ফুলের মরশুম
ঘটনা
যে ঘটনা কিছুক্ষণ পরে ঘটবে
সে আসে আমার সঙ্গে পরামর্শ করতে
পোশাক ও পরিচ্ছদ ,চলন ও ভাষা ,দৃষ্টি ও প্রকাশ
কীভাবে বাছা হবে
কাকে কাকে করা হবে কুশীলব
সেসব বিষয়ে কিছু আলোচনা
যে নাটকে একক অভিনয় থাকবে আমার
আলোর প্রয়োজন হবে না মঞ্চে
থাকবে না নহবত বা রুদালি
সে আমাকে আমন্ত্রণ করে গলবস্ত্রে
"তুমি যাও, আমি আসছি" - একথা বলব আমি
ঘটনা আগাম এও জানে
প্রেম
বিষ খাওয়ার পর মাথায় চক্কর লাগে
বমি পায়
ঘাম হয় খুব
এরপর ঝিমুনি আসে তীব্র ,তীব্রতর
মাটিতে লুটিয়ে পড়ি
তবু বিষ যদি কোনোদিন আমাকে অবজ্ঞা করে
নিজেকে বিলাতে থাকে অন্যের জলের গেলাসে -
আমারই সম্মুখে
জর্জরিত হয়ে উঠি বিষের বিরহে
ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠে প্রাণ
বিষের অভাবে
রোজ
রাস্তার ডাকে সাড়া দিই
মেলে না কিছুই
একমুঠো পাথর ছাড়া
সামান্য যেটুকু মাটি
এখনও রয়েছে প্রতি লোমকূপে
একএকটি পাথর পুঁতি সেইখানে
প্রতিটি পাথর থেকে
অংকুর বার হবে -
এই আশা নিয়ে
নব্বই মিনিট
সময় বুঝে গেছে
গোল করা হোক আর না হোক
সময় তার হাতে আর বেশি নেই
প্রতিটি গাছে
পাতা কমে বেড়ে উঠছে কাঁটা
সবুজ মাটি
পাল্টাতে চাইছে মরু হয়ে
তুমি এসময়ে কী ভাবছ
মনের স্ট্যাটাস কেমন রেখেছ
ঋতুর শরীরে ধরা পড়ে না
সময় জানে তার ডাকনাম অনন্ত
অথচ বাঁশি থাকে রেফারির হাতে
আকার
গেলাসে ঢালি
কুঁজোয় ঢালি
ঢালি বগি থালায়
সম্পাদক যে কবি-পরিচিতি চেয়েছিলেন
খুঁজে পাইনি
ভুজ সংখ্যা দিয়ে
কঠিন পদার্থের আকার বোঝায়
আমার ভুজ নেই
আকার নেই
আমি তাই কঠিন নই
এক মর্মরমূর্তি কাল ভেঙে গেছে
আকারবিহীন ঝড়ের আলিঙ্গনে
বিকার
প্রেমে পড়লে নাকি মানুষের এরকম হয়
বিশেষত পাথরের প্রেমে
কলিংবেল ,রিং-টোন, মর্মরধ্বনি ,ফিসফিসানি
প্রত্যেকেরই বানান ,অর্থ ,ব্যুৎপত্তি
সব এক হয়ে যায়
চান করার সময়
খুব সঙ্গত কারণেই
অসংখ্য পাথর ছুঁড়ি নিজের দিকে
হে মহান ,হে দরদী ,হে প্রাণঘাতী প্রেম
লগ্ন
প্রতিদিন
দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে
কষ্ট বেড়ে যায়
খাতার ,গাছের ,চোখের পাতারা
তা বোঝে
প্রতি গানে
গানের একটা নির্দিষ্ট চরণে
ফেনা বেড়ে ওঠে
সাবান ,সমুদ্র এবং অভিমান
তা বোঝে
ভয়
আঁকার সময় , গড়ার সময় , ছোঁবার সময়
আশঙ্কা সত্যি হয়ে ওঠে
আশঙ্কার সত্যবাদিতা
কেউ কি পচ্ছন্দ করতে পারে ?
আঁকি না ,গড়ি না ,ছুঁই না
কেবল টিকিট কাটি
প্রদর্শনীতে যাবার জন্য
চুরি
উপযুক্ত আলো এবং বাতাসের আনুকূল্যে
সমস্যার বাড়ে এখন বাড়ন্ত নেই
সংখ্যায় ,মেদে এবং কাঁটা-বাহুল্যে
তারা এখন বেশ ভয়ংকর
বাইরে তাপমাত্রা পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি
ঘরে ,কৃত্রিম আয়োজনে ,কিছুটা শাসনে রেখেছি তাকে
সার্কাসের চেয়ারে বসে আছে বাঘ
বাঘের মধ্যে লুকিয়ে আছে ওত
বিদ্যুৎ-যোগান যেন বন্ধ না হয় প্রভু
অন্ধকার কেবল আমাদের নয়
চুরি করবে তোমাকেও
না বলা
যা বলতে চাই ,প্রায় বলে ফেলি ,তাকে
কিছুই না বলতে শেখাই
সূর্যের রঙ যে কালোর উৎকৃষ্ট উদাহরণ
তা বলি না
সকলে যেমন সোনা ও প্লাটিনাম বলে জয়ধ্বনি করে
আমিও তেমনই
আর অন্ধকার গুদামে ধাতুমল মেখে তারা ঘুমায়
ঘুম দিয়ে মানুষ অনেক মানচিত্র চেপে রাখে
আর সেই 'চেপে রাখা' হরমোনকে অতিরিক্ত উদ্দীপ্ত করলে
স্বয়ং চাপা পড়ে যাই আমরা
কত কথা যে সঠিক করে বলা হয়নি
মহাকাব্যের প্রতি চরণ তা জানে
সেইসব বেঠিক বলা পুরাণের জামা পড়ে
সত্যের সঙ্গে করমর্দন করি রোজ
কথা
অশোকতরু আর আমি কথা বলি
আসলে আমি কথাকে তেমন ভালোভাবে চিনি না
অশোক চেনে
এবং ও-ই আমাকে শেখায়
কীভাবে কথাকে বলাতে হয়
ছোটো ছোটো ব্যাটারি অথবা
সর্ষের কাঁকর নিয়েও
আমরা কথা বলতে পারি বিস্তর
শিক্ষামন্ত্রীর হাতে কতজন শিক্ষক ও ছাত্র খুন হয়েছেন
তা নিয়েও
কথার নিজস্ব এক অন্যরকমের পছন্দ আছে
অংকের জন্য কোনো ফর্মুলা সে মানে না
দেশি কুকুরের প্রসঙ্গ থেকে নিমেষেই চলে যায়
ক্লিওপেট্রা বিষয়ক হরমোনে
কবিতার ইজ্জত
কবিতার ইজ্জত ধূলিস্যাৎ করলেন স্বয়ং এক মুখ্য
দ্বারকাধিপতি তো দূরের কথা
দু-পা মাটিতে রেখে দাঁড়াবার সামান্য সম্বলটুকুও নেই আমার
এর জমি ,ওর বাড়ি ,এর বাগান ,ওর পেশিতে
এক এক মুহূর্তের জন্য এক এক পা রেখে রেখে
লাফিয়ে লাফিয়ে ,ভেসে ভেসে আছি
জরায়ুকালীন সময় থেকেই
তবুও কবিতা আমার শরণাপন্ন হল
ইজ্জত তো গেছেই তার ,আমি আর কী করতে পারি
পাশ করা ,নামীদামি চিকিৎসকগণ তাকে বাঁচাতে পারতেন
অন্তত প্রাণটুকু ,যাদুঘরে রাখার জন্য
বিমুখ তারাও
আমি এক মৃতজীবী , মিথোজীবী
আমি তাকে কীভাবে বাঁচাই
মুখ্যের লেলিয়ে দেওয়া ধর্ষক-সমাজ ,রাজপথে, তাকে নগ্ন করেছে
আমি তবু ,যদিও অতি তুচ্ছ , শুদ্ধতা
কৌলিন্যবিহীন কয়েকটি চরণে
লুকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করি তাকে
হে পাঠক ,অনুগ্রহ করে ,এ খবর গোপন রেখেন
চিরন্তন-তুমি
তুমি তো সেই এক চিরন্তন-তুমি
লোহার মতো যে সবার আগে চুম্বকের
চুম্বককে যে কেন চুম্বক বলা হয়
তা তুমি জানো ,আমি জানি
না-জানার অর্থ দিয়ে চুম্বকও তা জানে
যেমন, আমি কেন মরচে
মেঘের সন্ধি বিচ্ছেদ করলে
জল পাওয়া যায় ,বিদ্যুৎ পাওয়া যায়
খানিকটা ব্যথা আর
চিঠিও পাওয়া যায় কিছু
হাজার হাজার তুমি দিয়ে একএকটা পাড়া
পাড়ার দখল থাকে চুম্বকের হাতে
লিটিল ম্যাগাজিন
তোমাদের কবিতারা চতুর্দিক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে
পাইক বরকন্দাজ সহ
অভিজাত কাগজে তাদের দেহ-সৌষ্ঠবের প্রদর্শনী
কত কত তারা লাগানো বাতানুকূল ঘরে
লিটারারি মিটের ফেনা
আমার বাড়ির পাশে
সেগুন গাছের বড় বড় পাতা
সেখানে দুচার লাইন লিখতেই পারি , ভেবেছিলাম
অসীম সৌভাগ্যক্রমে
আমার প্রত্যেকটি চিন্তাই অলীক বিশেষণে ভূষিত হয়
বড় বড় ডলারে বিক্রিত তাদের শরীর
একটা সাদা টগর গাছের গোড়ায়
জল ঢালি , মাটি দিই , সার দিই
তবু গাছটা একটু একটু করে
মৃত্যুকেই শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকার করে নেয়
বিশেষ অসুখ
আর যত যত অসুখ করেছিল শরীরে ,মেধায় ও কাগজে কলমে
চিকিৎসায় সেরে গেছে একসময়
একটি অসুখ শুধু ,ছাড়া তো দূরের কথা ,ক্রমশ বেড়েছে
ব্যাকটেরিয়া নেই ,ফাংগাস নেই ,ভাইরাস নেই
কেবল লক্ষণ আছে :-
তুমি ক্রমশই সুন্দর হয়ে ওঠো ,সুদূর হয়ে ওঠো , বিষাক্ত হয়ে ওঠো
যত আর আর গান আছে মুখরা ,অন্তরা ও সঞ্চারিতে
কণ্ঠে কণ্ঠে আকার পেয়েছে
একটি গানের সুর শুধু ভেসে গেছে , বায়ুহীন আন্দোলনে
একরকমের হারিয়ে যাওয়ার স্মৃতি এসব
ডিলিট হয় না কোনো ডিভাইস থেকে
- Get link
- X
- Other Apps